মা–বাবা ও দুই বোনের সবাই মারা গেল। পরিবারের কেউ তো আর বেঁচে নেই। এখন যদি আল্লাহ মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখেন, এটাই কামনা। আর তো কিছু চাওয়ার নেই।’
কথাগুলো বলতে বলতে জেসমিন রহমানের কণ্ঠ বারবার রুদ্ধ হয়ে আসছিল। এই অবস্থার মধ্যে তিনি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত তাসনিয়া ইসলাম প্রেমার (১৮) জন্য সবার কাছে দোয়া চাইলেন। সম্পর্কে প্রেমার ছোট মামি হন জেসমিন।
গতকাল বুধবার সকালে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে বাস–মাইক্রোবাসের সংঘর্ষের এ ঘটনায় ১০ জন নিহত ও গুরুতর আহত হন তিনজন
এ দুর্ঘটনায় মা–বাবা ও দুই বোন মারা গেছে তাসনিয়ার। তিনি এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন এই কলেজছাত্রী।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দেখা যায়, আইসিইউর সামনের পরিবেশ নীরব–নিস্তব্ধ। পিনপতনের শব্দও শোনা যাচ্ছিল।
আইসিইউর সামনে অপেক্ষায় থাকা তিন রোগীর স্বজনের অবস্থা হতবিহ্বল। একটু ‘সুখবরের’ আশায় চাতক পাখির মতো প্রতীক্ষা তাঁদের। তাঁদের একজন তাসনিয়ার মামি জেসমিন।
আইসিইউর সামনের বারান্দায় অস্থিরচিত্তে জেসমিন পায়চারি করছিলেন।
দুর্ঘটনায় তাসনিয়ার বাবা ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (৪৮), মা লুৎফুন নাহার (৩৭), দুই বোন আনিশা আক্তার (১৪), লিয়ানা (৮) ও স্বজন তানিফা ইয়াসমিন (১৬) মারা যায়। এ সময় গুরুতর আহত হন তাসনিয়া।
ঈদের ছুটিতে রফিকুল–লুৎফুন দম্পতি তাঁদের তিন সন্তান, আত্মীয় ও রফিকুলের এক সহকর্মী ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার দিলীপ বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যরা পর্যটন শহর কক্সবাজারে ঘুরতে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ গতকাল রাতে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রফিকুল ও দিলীপ ঢাকায় পোশাক কারখানায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক অনেক পুরোনো।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকালে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী রিলাক্স পরিবহনের দ্রুতগতির যাত্রীবাহী একটি বাস চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকার মহাসড়কের একটি বাঁকে আসে। তখন চালক ‘হার্ড ব্রেক’ করতে গেলে বাসটির সামনের অংশ ঘুরে মহাসড়কে আড়াআড়ি হয়ে যায়। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা কক্সবাজারগামী দ্রুতগতির একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তেই কক্সবাজারগামী দ্রুতগতির আরেকটি মাইক্রোবাস দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
হাইওয়ে পুলিশ ও স্বজনেরা জানান, হতাহত ব্যক্তিরা একটি মাইক্রোবাসের আরোহী ছিলেন।
তাসনিয়াসহ এ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত তিনজন এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত অন্য দুজন হলেন দুর্জয় কুমার বিশ্বাস (১৮) ও তাঁর স্বজন আরাধ্য বিশ্বাস (৮)। তিনজনের অবস্থাই এখন আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
দুর্ঘটনার পর চমেক হাসপাতালে আনা হলে তাসনিয়াকে আইসিইউয়ে নেওয়া হয়। তবে আজ সকালেও তাঁর অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলে জানান মামি জেসমিন।
‘ভাগনির অবস্থা খুবই খারাপ। ঢাকায় যে নিয়ে যাব, সে অবস্থাও নেই। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে এখনো কোনো রেসপন্স করেনি সে। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাঁরা দোয়া করতে বললেন।’
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে আরাধ্যর বাবা দিলীপ বিশ্বাস ও মা সাধনা মন্ডলের। দুর্জয় হলো সাধনার ভাতিজা।